আমাদের সমাজে একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। আমরা মানুষকে বিচার করি তার পোশাক দেখে, তার গাড়ি দেখে, আর সে কোথায় থাকে তা দেখে। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার চোখে দেখা শহরের সবচেয়ে ধনী মানুষটা হয়তো আজ রাতে ঋণের চিন্তায় ঘুমাতে পারছে না? আর আপনার পাশের ফ্লাটে থাকা যে সাধারণ ছেলেটাকে আপনি কোনো পাত্তাই দেন না, সে হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সম্পদশালী ব্যক্তি? আজ আমি আপনাদের দুই ভাইয়ের গল্প শোনাব। রফিক আর সুমন। এটা কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, এটা আপনার, আমার এবং আমাদের আশেপাশের ৯৯ শতাংশ মানুষের জীবনের গল্প। এই গল্পটা আপনাকে শেখাবে যে ১ কোটি টাকা হাতে পাওয়ার চেয়ে, ১ কোটি টাকা ম্যানেজ করার যোগ্যতা অর্জন করা কেন হাজার গুণ বেশি জরুরি। বড় ভাই রফিক, যে আজ থেকে ১০ বছর আগে বাবার রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তি আর রানিং ব্যবসা হাতে পেয়েছিল। আর ছোট ভাই সুমন, যে শূন্য হাতে রাস্তায় নেমেছিল। সাধারণ গণিত বলে, ১০ বছর পর রফিকের আরও ধনী হওয়ার কথা, আর সুমনের স্ট্রাগল করার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টোটা। ১০ বছর পর রফিক আজ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব, আর সুমন আজ সেই সাম্রাজ্যের রাজ, কিন্তু কেন? কী এমন গোপন সূত্র সুমন জানত যা রফিক জানত না? আজকের এই ১৭ মিনিটের ভিডিওতে আমরা সেই গোপন রহস্যটাই ভাঙব। এই ভিডিওটি দেখার পর আপনার টাকার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সারাজীবনের জন্য বদলে যাবে।
তাই নড়েচড়ে বসুন, কারণ জীবনের মোড় ঘুরতে খুব বেশি সময় লাগে না। গল্পের শুরুতে ফিরে যাই। রফিক যখন ব্যবসার দায়িত্ব পেল, তার প্রথম কাজই ছিল সমাজকে দেখানো যে সে কতটা সফল। মনে রাখবেন, টাকা মানুষের স্বভাব বদলায় না, বরং স্বভাবকে আরও প্রকট করে তোলে। রফিকের হাতে যখন কাঁচা টাকা আসা শুরু হলো, সে প্রথমেই ফোকাস করল 'লায়াবিলিটি' বা দায়ের ওপর। সে দামী গাড়ি কিনল, বড় ফ্ল্যাট ডেকোরেশন করল, প্রতি উইকেন্ডে পার্টি দিল। কেন জানেন? কারণ রফিক চেয়েছিল 'রিসপেক্ট' বা সম্মান। আর আমাদের ভুল ধারণা হলো, মানুষ আমাদের দামী জিনিস দেখে আমাদের সম্মান করে। কিন্তু সাইকোলজি অফ মানি বা টাকার মনস্তত্ত্ব বলে মানুষ যখন আপনার দামী গাড়ি দেখে, তারা আপনাকে দেখে না, তারা গাড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবে, ইশ! আমার যদি এমন একটা গাড়ি থাকত! রফিক ভাবছিল সে সম্মান কিনছে, আসলে সে নিজের ইগো বা অহংকারকে খাওয়াচ্ছিল। অন্যদিকে ছোট ভাই সুমনের দিকে তাকান। তার কাছে বাবার সম্পত্তির কোনো অংশ ছিল না। সে একটা ছোট চাকরি দিয়ে শুরু করেছিল। রফিক যখন পার্টিতে হাজার হাজার টাকা ওড়াচ্ছে, সুমন তখন লাইব্রেরিতে বসে ওয়ারেন বাফেটের বই পড়ছে। রফিক যখন নতুন আইফোন কেনার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছে, সুমন তখন তার বেতনের ২০ শতাংশ টাকা দিয়ে ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনছে। রফিক ছিল 'ইনকাম রিচ' মানে তার প্রচুর আয় ছিল, কিন্তু মাস শেষে পকেটে কিছুই থাকত না। আর সুমন হতে চেয়েছিল 'ওয়েলথ রিচ' মানে সে যা জমাবে, সেটা তাকে আরও টাকা এনে দেবে। রফিক খেলছিল দেখানোর খেলা, আর সুমন খেলছিল জমানোর খেলা।
এই মানসিক পার্থক্যটাই তাদের গন্তব্য ঠিক করে দিয়েছিল। প্রথম ৩-৪ বছর বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল রফিকই রাজা। তার লাইফস্টাইল, তার গ্ল্যামার সবকিছুই চোখের ধাঁধাঁ। সুমনকে দেখে আত্মীয়-স্বজনরা হাসাহাসি করত। বলত, দেখ দেখ, বড় ভাই লাখে খেলে, আর ছোট ভাইটা হাড়কিপ্পা, ছেঁড়া জুতো পায়ে দিয়ে হাঁটে। কিন্তু সুমন একটা জিনিস জানত যা রফিক জানত না। সেটা হলো 'কম্পাউন্ডিং ইফেক্ট' বা চক্রবৃদ্ধি মুনাফা। আইনস্টাইন এটাকে বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য বলেছিলেন। সুমন তার জমানো টাকা খরচ করেনি। সে সেই টাকা ব্যবসায় খাটিয়েছে, সেই ব্যবসার লাভ দিয়ে জমি কিনেছে, সেই জমির আয় দিয়ে আবার ব্যবসায় ইনভেস্ট করেছে। এটা অনেকটা বাঁশঝাড়ের মতো। চাইনিজ বাঁশ গাছের বীজ বুনলে প্রথম ৫ বছর মাটির ওপরে কিছুই দেখা যায় না। মনে হয় গাছটা মরে গেছে। কিন্তু মাটির নিচে সে তার শেকড় বা ফাউন্ডেশন শক্ত করতে থাকে। তারপর ৫ বছর পর, মাত্র ৬ সপ্তাহে সেটা ৯০ ফুট লম্বা হয়ে যায়। সুমন ছিল সেই বাঁশ গাছ। প্রথম ৫ বছর তার কোনো উন্নতি কেউ দেখেনি। তার জামাকাপড় পুরনোই ছিল। সে বাসে যাতায়াত করত। কিন্তু তার ব্যাংক ব্যালেন্স আর ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিও তখন রকেটের গতিতে বাড়ছিল। সে জানত, আজকে যদি সে ১ লাখ টাকার একটা বাইক কেনে, তাহলে সে শুধু ১ লাখ টাকা খরচ করছে না; সে ওই ১ লাখ টাকা দিয়ে ভবিষ্যতে যে ১০ লাখ টাকা আয় করতে পারত, সেই সুযোগটাকেও হত্যা করছে। একে বলে 'অপরচুনিটি কস্ট'। সুমন তার বর্তমানের সুখকে বিসর্জন দিয়েছিল ভবিষ্যতের স্বাধীনতার জন্য। এবার আসি রফিকের পতনের কারণ বিশ্লেষণে। রফিকের সমস্যা আয় করা ছিল না, তার সমস্যা ছিল 'লাইফস্টাইল ইনফ্লেশন'।
অর্থাৎ, আয় বাড়ার সাথে সাথে তার খরচও সমান তালে বাড়ছিল। সে ভাবত, আগামী মাসে তো ব্যবাসায় লাভ হবেই, তাহলে আজ খরচ করতে সমস্যা কী? কিন্তু বিপদ কখনো বলে আসে না। হঠাৎ মার্কেটে মন্দা দেখা দিল। ব্যবসার অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল। কিন্তু রফিক তার লাইফস্টাইল ছোট করতে পারল না। কারণ, একবার বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেখান থেকে নিচে নামা মৃত্যুর সমান মনে হয়। ফলে সে কী করল? সে লোন নেওয়া শুরু করল। প্রথমে ক্রেডিট কার্ড, তারপর পার্সোনাল লোন, তারপর ব্যবসার নামে লোন। সে এক গর্ত থেকে বাঁচার জন্য আরেক গর্ত খুঁড়তে শুরু করল। সে ভেবেছিল এটা সাময়িক। কিন্তু ঋণ হলো উইপোকার মতো, যা ভেতর থেকে আপনার মেরুদণ্ড খেয়ে ফেলে, আর আপনি টেরও পান না। রফিক যে দামী গাড়িগুলো কিনেছিল, শোরুম থেকে বের করার পরই সেগুলোর দাম ৩০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। বিপদের সময় যখন সে ওগুলো বিক্রি করতে গেল, দেখল সে যা দিয়ে কিনেছিল তার অর্ধেক দামও পাচ্ছে না। অর্থাৎ, তার শখের বস্তুগুলো আসলে ছিল একেকটা পরগাছা, যা তার রক্ত চুষে খাচ্ছিল। রফিক বুঝতে পারল, সে এতদিন নিজের সম্পদ বাড়ায়নি, সে শুধু ব্যাংকের দালান বড় করেছে। ঠিক এই সময়, যখন রফিক দেউলিয়া হওয়ার পথে, তখন দৃশ্যপটে সুমনের আসল রূপ প্রকাশ পেল। গত ৮-৯ বছর ধরে সুমন যে ছোট ছোট ইনভেস্টমেন্টগুলো করেছিল, সেগুলো এখন বিশাল আকার ধারণ করেছে। তার কেনা সেই সস্তা জমিগুলোর দাম এখন আকাশচুম্বী। তার শেয়ারগুলো তাকে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ দিচ্ছে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সুমনের এখন আর কাজ করার দরকার নেই। সে যদি সারাদিন ঘুমাতেও থাকে, তার টাকা তার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। একেই বলে 'প্যাসিভ ইনকাম'। রফিক টাকার জন্য কাজ করেছে, আর সুমন টাকাকে গোলাম বানিয়ে নিজের জন্য খাটিয়েছে। যখন রফিকের পৈতৃক বাড়িটা ব্যাংকের ঋণের দায়ে নিলামে উঠল, তখন সেটা কিনতে কোনো বাইরের লোক আসেনি। সেটা কিনতে এসেছিল সুমন। কিন্তু সে কোনো অহংকার নিয়ে আসেনি। সে এসেছিল এটা প্রমাণ করতে যে, ধৈর্য এবং সঠিক পরিকল্পনা ভাগ্যকেও হার মানাতে পারে। সুমন বাড়িটা কিনে নিল, কিন্তু সে রফিককে অপমান করল না। বরং সে রফিককে একটা অফার দিল। সে বলল, "এই বাড়ি তোমারই থাকবে, কিন্তু তোমাকে আমার কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট শিখতে হবে।" সুমন বুঝতে পেরেছিল, টাকা দিয়ে কাউকে সাহায্য করা যায় না, সাহায্য করতে হয় বুদ্ধি দিয়ে। সে রফিককে টাকা দেয়নি, সে রফিককে 'মানি ম্যানেজমেন্ট' শেখাতে চেয়েছিল।
বন্ধুরা, রফিক আর সুমনের এই গল্প থেকে আমরা তিনটি মেইন লেসন বা শিক্ষা নিতে পারি যা আজ থেকেই আপনার অ্যাপ্লাই করা উচিত নাম্বার ১: নিজের আয়ের চেয়ে কম খরচ করুন। আপনি কত টাকা আয় করেন সেটা বড় কথা নয়, আপনি কত টাকা ধরে রাখতে পারেন সেটাই আসল। যদি আপনি মাসে ১ লাখ টাকা আয় করে ১ লাখ টাকাই খরচ করে ফেলেন, তবে আপনি গরিবের চেয়ে ১ টাকাও বেশি ধনী নন। নাম্বার ২: সম্পদ বনাম দায় চিনুন। যা আপনার পকেটে টাকা ঢোকায় তা সম্পদ যেমন ব্যবসা, জমি, স্টক। আর যা পকেট থেকে টাকা বের করে নেয় তা দায় যেমন দামী ফোন, অতিরিক্ত জামাকাপড়। বড়লোক হতে চাইলে সম্পদ কিনুন, আর গরিব থাকতে চাইলে দায় কিনুন।
নাম্বার ৩: ধৈর্যের শক্তি। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্কিম থেকে দূরে থাকুন। সুমনের মতো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করুন। আজকের স্যাক্রিফাইস বা ত্যাগ আগামীকালের বিলাসিতা হয়ে ফিরে আসবে। আজ রাতে আপনি যখন ঘুমাতে যাবেন, নিজেকে একবার প্রশ্ন করবেন। আপনি কি রফিকের মতো দৌড়াচ্ছেন, নাকি সুমনের মতো ভিত্তি গড়ছেন? সমাজ আপনাকে কী বলল তাতে কিছু যায় আসে না। দিন শেষে আপনার ব্যাংক ব্যালেন্স এবং আপনার মানসিক শান্তিই আসল। টাকা কামানো একটা স্কিল বা দক্ষতা, কিন্তু টাকা ধরে রাখা একটা আর্ট বা শিল্প। সুমন সেই শিল্পী হতে পেরেছিল। আপনিও পারবেন। শুরুটা ছোট হোক, তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু শুরুটা আজই হওয়া চাই। ভিডিওটি যদি আপনার চিন্তার জগতে একটুও ধাক্কা দিয়ে থাকে, তবে শেয়ার করুন আপনার সেই বন্ধুর সাথে যার এই কথাগুলো শোনা খুব দরকার। আর হ্যাঁ, আপনি জীবনের রেসে কোন ট্র্যাকে আছেন রফিক না সুমন? কমেন্ট করে আমাদের জানাতে ভুলবেন না। দেখা হবে বিজয়ের মঞ্চে, ততক্ষণ ভালো থাকুন, ধনী হোন মনে এবং ধনে। ধন্যবাদ।

Comments
Post a Comment